বাঙালি জীবনে বাংলা নববর্ষের প্রভাব
Pohela Boishakh

বাঙালি জীবনে বাংলা নববর্ষের প্রভাব

বাঙালি জীবনে বাংলা নববর্ষের প্রভাব

ভূমিকা : পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এই দিনটি বাংলা নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। পহেলা বৈশাখ দিনটি যতটা ধর্মীয় অনুভূতি সিক্ত তার চেয়েও গুরুত্ব বাঙালির সর্বজনীন সংস্কৃতি দিন হিসেবে । সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই বাঙালিরা দিনটি বিচ্ছিন্নভাবে পালন করে আসছে বলে বিভিন্ন গবেষকরা মত প্রকাশ করেছে । সভ্যতার আবর্তন বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঋতু রাজ্যের জ্ঞান মানুষের মধ্য বেগবান রয়েছে । গত একটি বছরে যত দুঃখ কষ্ট সব ভুলে গিয়ে নতুন বছরের প্রথম দিনে মেতে ওঠে নতুন উদ্দীপনায় নতুন আশা নতুন স্বপ্ন নিয়ে শুরু করে বছরের প্রথম দিন। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে উদযাপিত আনন্দ। সবাই ভুলে যায় মনের কোণে জমে থাকা ব্যথাগুলো । সকল ধর্মাবলম্বীরাই উপভোগ করে এই আনন্দ । সবাই একত্রিত হয় মঙ্গল শোভাযাত্রায় প্রতিদিনের মতো অন্ধকার ভেদ করে একটা সকাল আসে কিন্তু পহেলা বৈশাখে যেন এক নতুন বার্তা নতুন উচ্ছাস-উদ্দীপনা নিয়ে সূর্যোদয় হয।
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস : একসময় নববর্ষ পালিত হতো আবর্তন উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে । তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির কারণ কৃষি কাজ ছিল ঋতু নির্ভর।আর কৃষি কাজের সুবিধার্থে মোঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর করা হয় তার সিংহাসন আরোহণের সময় থেকেই অর্থাৎ ৫ই নভেম্বর ১৫৫৬ সনে । সেই তখন থেকে কৃষিপ্রধান সমাজে এই দিনটি সমাদৃত । পহেলা বৈশাখ যেমন বাঙালির হৃদয়ের নতুন উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে তেমনি ভূমিহীন অর্থাৎ বর্গাচাষীদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে দিনটি আবির্ভূত হয় । শুরুতে এই দিনে সম্পাদন করা হতো জমিদারের রাজস্বের হিসাব । প্রজারা বকেয়া খাজনা পরিশোধ করে মিষ্টিমুখ করত । ব্যবসায়ীরা চুকিয়ে নিত তাদের হিসাব




নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠান :
মেলা : নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য মেলা অন্যতম । প্রায় প্রতিটা গ্রাম-মহল্লায়ই নববর্ষের মেলা অনুষ্ঠিত হয় । মেলায় শিশুরা ছুটে আসে বিভিন্ন খেলনার দোকানে । স্থানীয় কৃষিকাজ দ্রব্য, কারুপণ্য ,লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্প জাত সামগ্রী এবং সব প্রকার হস্তশিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এই মেলায় পাওয়া যায় । আরো পাওয়া যায় বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্য ।মেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিতি থাকে । তারা যাত্রা, পালা গান ,কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজীর গান, আলকাপ গান সহ বিভিন্ন ধরনের লোকসংগীত বাউল ,মারফতি, মুর্শিদি, ভাটিয়ালি ইত্যাদি আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন ।চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ,নাটক, নাগরদোলা ,সার্কাস ইত্যাদি মেলার বিশেষ আকর্ষণ । এছাড়াও কোন কোন মেলায় আয়োজন করা হয় বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলা কাবাডির। শিশু-কিশোর যুবক বৃদ্ধা সবাই মিলে উপভোগ করে খেলা । মেলায় সবাই উচ্ছ্বসিত উত্তেজিত সবাই নিজের মত করে উদযাপন করে মেলার আনন্দ ।
হালখাতা : অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা এটি পুরোপুরি একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার । গ্রামে-গঞ্জে –নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে পুরনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন । এই উপলক্ষ্যে তারা নতুন পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন । চিরাচরিত এই অনুষ্ঠানটি আজও আমাদের সমাজে বিদ্যমান ।
মঙ্গল শোভাযাত্রা : প্রতিবছর বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে আয়োজিত একটি তুলনামূলক ভাবে নতুন বর্ষবরণ উৎসব । বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলাদেশের ঢাকা শহরে একটি প্রবর্তিত হয় । একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ উৎস হিসাবে সারাদেশে এটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে ঢাকা শহরের শাহাবাগ রমনা এলাকায় এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয় ।
এই মঙ্গল শোভাযাত্রা চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন স্থানের ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে । শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ধরণের প্রতীকী শিল্পকার্য করা হয় । এছাড়াও বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়বাহী নানা প্রতীকী উপকরণ ,বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হয় ।তবে একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে প্রায় প্রতি জেলা সদরে এবং বেশকিছু উপজেলা সদরে পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্hh হওয়ায় এখন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা ’বাংলাদেশের নবতর সর্বজনীন সংস্কৃতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে ।

বৈসাবি এবং পানি উৎসব : পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িরা বৈসাবি উৎসব কি তিনটি ভাগে পালন করে প্রথম দিনটির নাম ফুলবিজু,এই দিন শিশু-কিশোররা ফুল তুলে ঘর সাজায় । দ্বিতীয় দিনটি হচ্ছে মুরুবিজু ঐদিনে হয় মূল অনুষ্ঠান । ঐদিন নানারকম সবজির সমন্বয় এক ধরণের নিরামিষ রান্না করা হয় যার নাম পাজন , এটি বৈসাবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য । এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা ও মিষ্টান্ন তৈরি করা হয় । অতিথিদের জন্য ঐদিন সবার ঘরের দরজা খোলা থাকে । নববর্ষের দিন মারমা উপজাতিরা আয়োজন করে ঐতিহ্যবাহী পানি খেলা । পানিকে পবিত্রতার প্রতীক ধরে নিয়ে মারমা তরুণ-তরুণীদের পানি ছিটিয়ে পবিত্র ও শুদ্ধ করে নেয় । পাহাড়ীদের মধ্য উৎসবটি অত্যন্ত জনপ্রিয।
নববর্ষে ঘোরাঘুরি : নববর্ষে পুরনো সব রাগ অভিমান দুঃখ কষ্ট ভুলে গিয়ে বেরিয়ে পড়ে প্রিয় মানুষটির সাথে। কেউ কেউ যায় মেলায় আবার কাউকে যেতে দেখা যায় পার্কে ।আবার অনেককেই দেখা যায় নদীর পাড়ে বসে গল্প করতে । ছোটদের বায়না মেটাতে কোন কোন পরিবারকে যেতে হয় শিশুপার্কে। আবার অনেক প্রাকৃতিক প্রেমী বন্ধুদের দেখা যায় গাছের ছায়ায় বসে যন্ত্র বিহীন গানে মেতে উঠত।

বাংলা নববর্ষের ঋতু ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য :বসন্তকে বিদায় দিয়ে বাংলা নববর্ষের মধ্য দিয়ে শুরু হয় গ্রীষ্ম । তখনও বসন্তের আবেশ ছড়িয়ে থাকে গাছে ,নদীতে, কোকিলের ডাকে । তখনও দেখা যায় কৃষ্ণচূড়া ফুলের রক্ত লাল সেই সৌন্দর্য ! মাঝে মাঝে হিমেল বাতাস প্রবাহিত হয়। গাছের কচি কচি পাতাগুলো দুলতে থাকে পাতার ফাঁকে ফাঁকে কোকিল ডাকে তার আপন সৌন্দার্যে। রাতের আধারে চাঁদের আলোতে দক্ষিণা বাতাসে ভেসে আসে জিজি পোকার ডাক|

নববর্ষের গুরুত্ব ও তাৎপর্য : নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত| ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ | নববর্ষে ঘরে ঘরে আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীদের আগমন ঘটে| মিষ্টি পিঠা পায়েস সহ নানা রকম লোকজ খাবার তৈরীর ধুম পড়ে যায়| সবাই এই দিনটিতে ভাল খাওয়া, ভাল পড়া এবং ভালো থাকার চেষ্টা করে ভবিষ্যতে মঙ্গলজনক মনে করে | এই সংস্কৃতি শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয় বাংলার সর্বস্তরে এই সংস্কৃতি বিদ্যমান |বাংলা সংস্কৃতিতে নববর্ষের গুরুত্ব অপরিসীম|


বাঙালি জীবনে বাংলা নববর্ষের প্রভাব: বাংলা নববর্ষে প্রতিটা জেলায়,উপজেলায় ইউনিয়নে, গ্রামে গ্রামে নববর্ষের আনন্দ উদযাপিত হয়| বর্ষবরণের চমকপ্রদ জমজমাট আয়োজন ঘটে রাজধানী ঢাকায় | এখানে বৈশাখী উৎসবের অনুষ্ঠানমালা এক মিলনমেলার সৃষ্টি করে | নববর্ষের প্রথম প্রভাতে রমনা উদ্যানে ও এর চারপাশের এলাকায় উচ্ছল জনস্রোতে সৃষ্টি হয় জাতীয় বন্ধন| ছায়ানটের উদ্যোগে জনাকীর্ণ রমনার বটমূলে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান “ এসো হে বৈশাখ এসো এসো …” এর মাধ্যমে নতুন বর্ষকে বরণ করা হয় | ১৩৭২ বঙ্গাব্দে ছায়ানট প্রথমে এ উৎসব শুরু করে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলার প্রভাতী অনুষ্ঠানেও নববর্ষকে সম্ভাষণ জানানো হয়| এখানে চারুশিল্পীদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নববর্ষের আহবানকে করে তোলেন নয়নমনোহর এবং গভীর আবেদনময় শোভাযাত্রা উপভোগ করে সব শ্রেণীর আবাল বৃদ্ধা বনিতা। এদিন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ টিএসসি এবং চারুকলা সহ সমগ্রহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পারিণত হয় জনসমুদ্রে । নববর্ষের সকালে মাটির পাত্রে পান্তা ইলিশ খাওয়া যেন পরম তৃপ্তরি বিষয় ।শীতকালে বৃক্ষলতা যেমনি চুপসে যায় কিন্তু বসন্তের আগামনে আবার তারা মাথা জাগিয়ে তোলে ফিরে পায় প্রফুল্লতা ঠিক তেমনি বাংলার প্রতিটা মানুষ গত একটি বছরের, দুঃখে-কষ্টে যতটা হতাশাগ্রস্থ ক্লান্ত হয়ে পড়ে তা যেন ধুলোর মতো উড়িয়ে দিয়ে নববর্ষে ফিরে পায় নতুন তাজা এক প্রাণ । বাংলার প্রতিটা মানুষ উৎসবপ্রিয় বাংলার অনেক উত্সবের মধ্য বাংলা নববর্ষ অন্যতম ।বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে আয়োজন করা হয় ভাল খাবারের ঘর গোছানো ঘর পরিষ্কার করা এটা যেন এক দায়িত্ব হয়ে পড়ে সবার । নববর্ষের সকালে সবাই তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে গোসল করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে । মোবাইল চিঠিতে বর্তমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় একদিন আগেই ,একে অপরকে বাড়িতে দাওয়াত করে ,রাস্তায় দেখা হলেই একে অপরকে শুভেচ্ছা বিনিময় করে । বাংলার সকল ধর্মালম্বীদের মধ্য একটি বন্ধন সৃষ্টি হয় এই নববর্ষের উৎসবের মধ্য দিয়ে । সবাই একত্রিত হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, শুভেচ্ছা বিনিময় করে পরস্পর কে ।সর্বশেষ বলা যায় বাংলা সংস্কৃতিতে বাংলা নববর্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস আর বাঙালি জীবনে বাংলা নববর্ষের প্রভাব সর্বস্তরেই বিদ্যমান ।
সমাপ্তি : বাংলা নববর্ষের মাধ্যমে প্রকাশ পায় বাংলার শত বছরের সংস্কৃতি ঐতিহ্য ।আমরা সবাই বাংলা নববর্ষের আনন্দ উদযাপন করব এবং বাঁচিয়ে রাখব আমাদের ঐতিহ্যকে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব দেশকে ভালোবাসা এবং দেশের সংস্কৃতি ,ঐতিহ্য কে রক্ষা করা ।

–শাওন আকন

বরিশাল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট